মোটর ভোটার : ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৯৫, কেন্দ্র : ১৫৯
নুপা আলম : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসীল ঘোষনার পর থেকে সারা দেশের মতো কক্সবাজার–১ (চকরিয়া–পেকুয়া) সংসদীয় আসনটিও নির্বাচনী মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। গ্রাম থেকে বাজার, হাট থেকে চায়ের দোকান সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কে হচ্ছেন পরবর্তী সংসদ সদস্য। এ আসনে এবারও প্রধান লড়াই গড়াচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে। কয়েকটি দলের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ ভোটের হিসাবকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তবে সকল সমীকরণ এখন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদকে ঘীরে। কেননা এই আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী তিনি। দীর্ঘদিন জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় এই নেতা চকরিয়া–পেকুয়ায় পরিচিত মুখ। আসনটিতে সালাহউদ্দিন আহমদ ৩ বারের সংসদ সদস্য ছিলেন। তার স্ত্রী হাছিনা আহমেদ ছিলেন একবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। সব মিলে বিএনপির দখলে আসনটি ছিল ৪ বার।
একই সঙ্গে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আসনটি থেকে জামায়াত প্রার্থী এনামুল হক মঞ্জু নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার দলটি থেকে ওই আসনে প্রার্থী হয়েছেন আব্দুল্লাহ আল-ফারুক। দলীয় শৃঙ্খলা ও সংগঠনের শক্তিকে সামনে রেখে তিনি মাঠে নামছেন। আর কৌশলগতভাবে এই আসনটি পুনঃউদ্ধারে মারিয়া হয়ে তৎপরতা চালাচ্ছে জামায়াত।
একই সঙ্গে আসনটি থেকে এবি পার্টি থেকে অধ্যাপক এবি ওয়াহেদ, এনসিপি থেকে ড. মাইনুল আহসান খান মনোনয়ন পেয়েছেন। এছাড়া আরও কয়েকটি দল থেকে প্রার্থী ঘোষণা হতে পারে। এসব প্রার্থী অংশগ্রহণ ভোটের হিসাবকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ভোটার ও এলাকার চিত্র :
চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত কক্সবাজার–১ আসনটি আয়তনে বড় ও জনবহুল।
কক্সবাজার জেলা নির্বাচন অফিস এর তথ্য মতে, এ আসনের মোট ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৯৫ জন ভোটারের মধ্যে চকরিয়া উপজেলার ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৪৯৬ জন। তার মধ্যে, পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫ হাজার ৪৩৫ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৮১ হাজার ৬১ জন। পেকুয়া উপজেলার ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৪৬ হাজার ৫৯৯ জন। তার মধ্যে, পুরুষ ভোটার ৭৯ হাজার ৩৭৫ জন এবং নারী ভোটার ৬৭ হাজার ২২৪ জন।
এ আসনে মোট ভোট কেন্দ্র ১৫৯ টি। তার মধ্যে, চকরিয়া উপজেলায় ভোট কেন্দ্র ১১৬টি। পেকুয়া উপজেলায় ভোট কেন্দ্র ৪৩ টি। এ আসনের পেকুয়া উপজেলায় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র কমেছে একটি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পেকুয়া উপজেলায় ভোট কেন্দ্র ছিলো মোট ৪৪ টি।
এ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তাবিত ১৫৯ টি ভোট কেন্দ্রে মোট বুথ সংখ্যা ৯৯১ টি। তারমধ্যে, পুরুষ বুথ ৪৯২ টি। নারী বুথ ৪৯৯ টি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে সরকার একইদিনে গণভোট করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভোট কেন্দ্র গুলোতে বুথ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সুত্র জানিয়েছে।
কৃষি, মৎস্য, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও প্রবাসী আয় এই এলাকার অর্থনীতির প্রধান ভরকেন্দ্র। তবে দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ ব্যবস্থা, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এখানকার মানুষের বড় সমস্যা।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এবার উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চান। একাধিক ভোটার বলেন, “ভোট দিতে চাই নির্ভয়ে। যাকে খুশি তাকেই ভোট দিতে পারব—এই নিশ্চয়তা আগে দরকার।” তরুণ ভোটারদের বড় একটি অংশ কর্মসংস্থান ও শিক্ষা নিয়ে ভাবছেন, আর বয়স্ক ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সামাজিক নিরাপত্তা ও কৃষি সহায়তা।
আগের নির্বাচনের যারা জয়ী হয়েছিল :
নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই আসনটিতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন হাছিনা আহমেদ। ওই নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদ সিআইপিকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন তিনি। ওই নির্বাচনে হাছিনা আহমেদ পান ১ লাখ ৫৬ হাজার ৫১২ ভোট। পরাজিত প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদ সিআইপির প্রাপ্ত ভোট ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ১১১টি।
এর আগে ২০০১ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত হন সালাহউদ্দিন আহমেদ। ওই নির্বাচনে সালাহউদ্দিন আহমেদের প্রাপ্ত ভোট ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬০২। পরাজিত আওয়ামীলীগের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদ সিআইপি পেয়েছিলেন ৭৪ হাজার ২৯৭ ভোট। এর আগে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও নির্বাচিত হন সালাহউদ্দিন আহমেদ। ওই নির্বাচনে সালাহউদ্দিন আহমেদের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৭২ হাজার ৫৯৪। পরাজিত আওয়ামীলীগের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদ সিআইপি পেয়েছিলেন ৫০ হাজার ৮২৯ ভোট। এছাড়া ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনেও সালাহউদ্দিন আহমেদ নির্বাচিত এই আসনের।
এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আসনটি থেকে জামায়াত প্রার্থী এনামুল হক মঞ্জু নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে এনামুল হক মঞ্জুর প্রাপ্ত ভোট ছিল ৩৭ হাজার ৮৯৩টি। পরাজিত আওয়ামীলীগেরে প্রার্থী জহিরুল ইসলাম পেয়েছিলেন ৩২ হাজার ৮৪৯ ভোট।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নানা পেশাজীবীর মতে, কক্সবাজার–১ আসনে ভোটের ফল নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর ভোটার উপস্থিতি, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনের পরিবেশ। বিএনপি প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জাতীয় পর্যায়ের পরিচিতি যেমন একটি বড় ফ্যাক্টর, তেমনি জামায়াত প্রার্থীর সংগঠিত ভোটব্যাংকও উপেক্ষা করার মতো নয়। যদি অন্য প্রার্থীরা শক্ত অবস্থান নেন, তবে ফলাফল আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে কক্সবাজার–১ আসনে নির্বাচন শুধু স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ করবে না, বরং জাতীয় রাজনীতির চলমান টানাপোড়েনের প্রতিফলনও ঘটাবে। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত ভোটের রায়ে কার হাতে যায় চকরিয়া–পেকুয়ার প্রতিনিধিত্ব।
