কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে দেশে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন হাব গড়ে তোলার নানা মেগা পরিকল্পনা কাগজ-কলমে বিদ্যমান। তবে বাস্তবায়নের বাস্তব চিত্র ঠিক তার উল্টো। দেশের প্রধান পর্যটন নগরীতে পা রেখে পর্যটকেরা প্রাতিষ্ঠানিক প্রমোশনাল গাইড কিংবা জরুরি সেবামুখী তথ্যের ন্যূনতম ছিটেফোঁটাও খুঁজে পান না। উল্টো পর্যটকদের তথ্যসেবা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা প্রধান দুই সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন’ (বিপিসি) এবং ‘বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড’ (বিটিবি)-এর প্রাঙ্গণ ও অবকাঠামো ঢেকে গেছে চটকদার বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে।
ভ্রমণ গাইড পড়ুন
তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসে বিশ্বমানের পর্যটন সুবিধা ও সৌন্দর্য বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার বদলে সরকারি এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে বেসরকারি বিজ্ঞাপনী এজেন্সির মতো ব্যবহার করে রাজস্ব বাণিজ্যে মেতে ওঠার অভিযোগ উঠেছে সংস্থা দুটির বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, লাবণী সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন হোটেল জোন ও সৈকতের প্রবেশমুখে পর্যটন করপোরেশনের মালিকানাধীন লাভজনক ও প্রমোশনাল স্পেসগুলোতে পর্যটন তথ্যের কোনো উপস্থিতি নেই। সংস্থাটির পরিচালনায় থাকা ‘হোটেল শৈবাল’ ও ‘মোটেল উপল’-এর সম্মুখভাগ এবং সীমানা প্রাচীরে স্থান পেয়েছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ালটন’-এর ২০টি বিশালাকার বিজ্ঞাপনী ব্যানার।
একই চিত্র লাবণী পয়েন্টের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার ও বিপিসির কোটি টাকার সম্পত্তি ‘মোটেল লাবণী’র মূল প্রবেশদ্বার সেজেছে একটি বাণিজ্যিক ‘স্পা’ পানির বিশালাকার বিজ্ঞাপনী ব্র্যান্ডিং। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকেরা পর্যটন তথ্যকেন্দ্র বা গাইডের বদলে শুরুতেই মুখোমুখি হন প্রাইভেট ব্র্যান্ডের কমার্শিয়াল প্রমোশনের।
ভ্রমণ টিকিট বুক করুন
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক তানভীর আহমেদ আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘একটি প্রধান পর্যটন শহরের মূল পয়েন্টগুলোতে সরকারি ট্রাভেল গাইড, দর্শনীয় স্থানের মানচিত্র বা কিউআর কোড থাকার কথা। কিন্তু এখানে নামলেই চোখে পড়ে বাণিজ্যিক প্রচারণা। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিজেদের প্রমোশন না দিয়ে বিজ্ঞাপনী এজেন্সির মতো কাজ করে, তবে সাধারণ পর্যটকেরা তথ্য পাবে কোথায়?’
পর্যটন করপোরেশনের নিজস্ব জমিতে পর্যটন প্রমোশন আড়াল করে বাণিজ্যিক ব্যানার ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের কক্সবাজারস্থ হোটেল শৈবালের ব্যবস্থাপক রায়হান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘পর্যটন করপোরেশন মূলত নিজেদের অর্জিত আয়ে চলে। তাই এসব খালি জায়গা ভাড়া দিয়ে করপোরেশনের রেভিনিউ বা আয় বাড়ানো হয়। তবে সেখানে পর্যটন বা পর্যটকদের সেবামুখী প্রচার-প্রচারণা না রেখে শুধুই করপোরেট কোম্পানির বিজ্ঞাপন রাখার বিষয়টি আমরা আগামীতে বিবেচনা করব এবং পরবর্তীতে পর্যটন সংক্রান্ত তথ্য সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
ভ্রমণ টিকিট বুক করুন
মোটেল লাবণীর প্রধান গেটে বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডিং প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মোটেল লাবণীর প্রধান গেটটি অনেক পুরোনো, এটি শীঘ্রই সরিয়ে ফেলা হবে। তাছাড়া বর্তমানে লাবণী হোটেলের নতুন ভবনের নির্মাণকাজও চলমান রয়েছে। আশা করছি পর্যটকরা ভালো সেবা পাবে।’
পর্যটনের প্রসার বিষয়ে বাণিজ্য মেলা ও পর্যটন কার্নিভাল আয়োজনের কথাও জানান তিনি। তবে পর্যটন প্রচারণা না থাকায় তথ্য ঘাটতির বিষয়ে আশ্বাস ছাড়া সুস্পষ্ট কিছু বলতে পারেননি তিনি।
এদিকে কক্সবাজারের বিমানবন্দর ও জেলার প্রবেশপথগুলোতে প্রমোশনাল ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব নিয়ে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের বিপণন ও ব্র্যান্ডিং বিভাগের উপপরিচালক মহিবুল ইসলাম জানান, ‘পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হলেও এর নির্দিষ্ট বাস্তবায়ন ও অর্থায়নের উৎস এখনও চূড়ান্ত নয়।’
অন্যদিকে সংস্থাটির উপপরিচালক (জনসংযোগ) বোরহান উদ্দিন দেশের বাইরে থাকায় সাম্প্রতিক উদ্যোগ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
তথ্য খুঁজুন
পর্যটন প্রমোশন বাদ দিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর এই নীতিহীন বাণিজ্যিক ইজারা চর্চাকে তীব্র সমালোচনা করেছেন খাত সংশ্লিষ্ট ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ‘পর্যটন করপোরেশনের অধীনস্থ হোটেল শৈবাল, মোটেল উপল, মোটেল লাবণীসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত তৈরি হয়েছিল পর্যটকদের সেবার জন্য। কিন্তু তারা সেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন এনজিও এবং ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দিয়ে রেখেছে। এখান থেকে সোজা কথায় কোনো পর্যটক লাভবান হচ্ছে না। মূল প্রতিষ্ঠানগুলোই যদি পর্যটনের প্রচার-প্রসারে কাজ না করে উল্টো বাণিজ্যে ঝুঁকে পড়ে, তবে সাধারণ পর্যটকদের জন্য পর্যটনের কোনো উন্নয়ন আমি দেখছি না।’
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মিল্কি বলেন, ‘পর্যটনসেবী সরকারি সংস্থাগুলো স্রেফ নিজেদের সাময়িক কিছু আয়ের জন্য প্রাইভেট কোম্পানির কাছে শহরের মূল প্রমোশনাল স্পেস ভাড়া দিয়েছে। ট্রাভেল গাইড বা ফেয়ার বোর্ড না থাকায় পর্যটকেরা এসে দালালের খপ্পরে পড়ছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি পর্যটকদের তথ্য না দিয়ে কমার্শিয়াল এজেন্টের মতো আচরণ করে, তবে পুরো পর্যটন খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
ভ্রমণ গাইড পড়ুন
বিপণন ও পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সেবা বা গন্তব্যের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং টিকিয়ে রাখার মূল শর্তই হলো সঠিক ও ধারাবাহিক প্রচারণা। আন্তর্জাতিক পর্যটন খাতে ‘পণ্য বা সেবা’ যদি দেহ হয়, তবে তার ‘প্রচারণা’ হলো প্রাণ। বিশ্বের যেকোনো উদীয়মান পর্যটন কেন্দ্র তার ব্র্যান্ড ভ্যালু ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে প্রবেশদ্বার ও অবকাঠামোগুলোতে সার্বক্ষণিক তথ্য ও দিকনির্দেশনা দৃশ্যমান রাখে।
আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও পর্যটন করপোরেশন কেবল নিজেদের হোটেলের চারদেওয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়; বরং পুরো দেশের পর্যটন প্রমোশন, ব্র্যান্ডিং ও পর্যটকদের তথ্যসেবা নিশ্চিত করার সরাসরি আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে তাদের ওপর। অথচ নিজস্ব বাণিজ্যিক আয়ের অজুহাতে তারা মূল দায়িত্ব জলাঞ্জলি দিয়ে পর্যটন এলাকাকে কমার্শিয়াল বিজ্ঞাপনের হাটে পরিণত করেছে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এই নীতিগত বিচ্যুতি বন্ধ করে অবিলম্বে অবকাঠামো ও প্রবেশদ্বারেে বাণিজ্যিক বিলবোর্ডের পাশাপাশি পর্যটকের জন্য পর্যটন তথ্যের প্রচার করা জরুরি। বিপিসি ও বিটিবির অন্তত ৩০ শতাংশ জায়গায় স্থায়ী ডিজিটাল ইনফরমেশন ডিসপ্লে ও ব্র্যান্ডিং বাধ্যতামূলক না করলে প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলায় বিশ্বমঞ্চে কক্সবাজার তার আন্তর্জাতিক আকর্ষণ ও মর্যাদা ফুটিয়ে তুলতে পারবে না।


Leave a Reply